August 9, 2026, 9:55 am
# হল ত্যাগের নির্দেশ অমান্য
# ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা
স্টাফ রিপোর্টার :
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ অমান্য
করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের
দাবিতে তার বাসভবনের সামনে অনড় অবস্থানে আছেন আন্দোলনরত
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন
প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংহতি সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিকাল ৪টা ৫০
মিনিটে ভিসির বাসভবনের সামনে এসে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। এদিকে ভিসির
বাসভবন ঘিরে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে রেখেছে পুলিশ। তবে
পুলিশের সামনেই অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
তারা বলছে আজ আবারো আন্দোলনে নামবেন তারা।
জানা গেছে, গতকাল বিকাল ৪টা
৫০ মিনিটে ভিসির বাসভবনের সামনে এসে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। হল ছাড়ার
নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে ভিসির অপসারণ দাবিতে অবস্থান নেন তারা। ভিসির
বাসভবন ঘিরে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা পুলিশের সামনেই
অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা।
এদিকে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরে
যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) আ স ম
ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘অধিকাংশ হল খালি হয়ে গেছে। হলগুলোতে তালা লাগিয়ে
দেওয়া হবে। এরপরও সিন্ডিকেটের নির্দেশ অমান্য করে যদি কেউ হলে অবস্থান করে
তবে এর জন্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
নেবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ হোক আমরা তা চাই না।
আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক। আজীবনের জন্য
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে না। পরিবেশ স্বাভাবিক হলে তারা ফিরে আসুক।
সিন্ডিকেটের নির্দেশ অমান্য করলে প্রয়োজনে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’
‘দুর্নীতির
বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ এর মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন
বলেন, বিকাল সাড়ে ৩টার মধ্যে সব হল ছেড়ে শিক্ষার্থীদের চলে যাওয়ার নির্দেশ
প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনকারীরা। তারা ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান
কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। রায়হান রাইন বলেন, ‘কোনও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে
শিক্ষকরা আক্রমণ করেছেন এমন নজির নেই। গতকাল প্রক্টর ছিলেন। পুলিশ ছিল।
শিক্ষকরাও ছিলেন। সবার চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটেছে। তারা নিরব ভূমিকা পালন
করেছে। তারা উল্টো উসকানি দিয়েছে। শিক্ষক সমতির সভাপতিও সেখানে ছিলেন।
ভিসির নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এই
নিরাপত্তাহীনতা কে তৈরি করেছে? প্রশাসন করেছে। দুর্নীতিবাজ ভিসি ফারজানা
করেছে। তাকে এই ক্যাম্পাসে কোনোভাবেই রাখা যাবে না। তাকে অপসারিত হতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প চলছে সেই মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের
জন্য হলেও তাকে সরে যেতে হবে।’
এর আগে গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টার
মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ
দেওয়া হয়। এর মধ্যে হল না ছাড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করা
হয়। গতকাল দুপুর ২টার দিকে হল প্রভোস্ট কমিটির বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি
অধ্যাপক বশির আহমেদ এই তথ্য জানান।
বুধবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের
নতুন কলা ও মানবিকী অনুষদ ভবনের পাশে মুরাদ চত্বরে জড়ো হতে থাকেন
আন্দোলনকারীরা। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবন
থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দেন আন্দোলনরত-শিক্ষার্থীরা। পরে
ভবনটির ফটক আটকে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুরাদ চত্বর থেকে একটি
বিক্ষোভ মিছিল বের করে হল ছাড়ার নির্দেশের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেন
শিক্ষার্থীরা।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের জরুরি
এক সভা শেষে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রথমে
বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশের কথা জানান ভারপ্রাপ্ত
রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জারি করা এক
বিজ্ঞপ্তিতে বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই
নির্দেশের পর শিক্ষার্থীরা হল ছাড়তে শুরু করলেও অনেকেই থেকে যান এবং গভীর
রাত পর্যন্ত আন্দোলনে অংশ নেন। পরে বুধবার সকাল থেকে আবার আন্দোলন শুরু
করেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। গতকাল থেকে হল সংলগ্ন খাবার দোকানগুলো বন্ধ
রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান অধ্যাপক বশির।
উল্লেখ্য,
দুর্নীতির অভিযোগে জাবি ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় তিন
মাস ধরে আন্দোলন চলছে। অক্টোবরের শেষ থেকে আন্দোলনকারীরা প্রশাসনিক ভবন
অবরোধ এবং সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করছিলেন। ফলে কার্যালয়ে যেতে পারছিলেন না
উপাচার্য। মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষক ও
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
হামলায় আট জন শিক্ষকসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। এই হামলার পর দুপুর ১টার দিকে
পুলিশ, জাবি শাখা ছাত্রলীগ, প্রশাসনপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের কড়া পাহারায় নিজ গাড়িতে করে বাসভবন থেকে
বের হন উপাচার্য। পরে সেখান থেকে নতুন প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে তিনি
সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। উপাচার্য তাকে ‘মুক্ত’ করার জন্য ছাত্রলীগের
প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা :
জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সংকট নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে
ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী।
তিনি বলেন, এ প্রসঙ্গে স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী নয়
শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গতকাল রাজধানীর আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা ইনস্টিটিউটের
সেমিনার কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা জানান।
জাবির
এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে কি
না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। আমরা চাইলেই সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। তবে
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ দিলে
আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে পারি।
তিনি বলেন, আমরা বলপ্রয়োগ করে
নয়, শৃঙ্খলা বজায় রেখেই সমাধান করতে চাই। কোথায় কোথায় দুর্নীতি রয়েছে, তা
আমাদের জানাতে হবে। আপনারা আসুন, অভিযোগ দিন। অযথা রাস্তায় নেমে বিশৃঙ্খলা
করবেন না।
ছাত্রলীগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করলে উপমন্ত্রী বলেন,
‘ছাত্রলীগের একটি ঐতিহ্য আছে। কেউ কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছাত্রলীগকে
দোষী সাভ্যস্ত করে। তবে ছাত্রলীগের পদে থেকে কেউ যদি সহিংসতার সঙ্গে জড়িত
থাকে তাদের অপসারণ করা হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাসহ যে অস্থিরতা
সৃষ্টি করা হয়েছে সেটি অনভিপ্রেত উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যলয়ের পরিস্থিতি
শান্ত রাখতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা
উপমন্ত্রী।
মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, জাবির চলমান অস্থির পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করেছেন।
উল্টো ভিসির বাড়ি ঘেরাও করাটা যৌক্তিকতার মধ্যে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ সিদ্ধান্ত সবার মেনে নেয়া উচিত।
তিনি
বলেন, ‘এ আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগরে শিক্ষকদের মধ্যে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে।
এক পক্ষ বলছে, দুর্নীতি হয়েছে। আরেক পক্ষ বলছে, যেখানে অর্থই ছাড় হয়নি,
সেখানে কীভাবে দুর্নীতি হলো বলে প্রশ্ন তুলছে। এ দুই গ্রুপের মাঝে তৃতীয়
আরেকটি গ্রুপ সহিংসতা তৈরি করতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। কেউ অন্যায়
করলে তাকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়াটা আইনগত অধিকার। বিচারের আগেই তার
ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।’
‘তাদের মধ্যে এক পক্ষ ইতোমধ্যে আমার
সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ৮ নভেম্বর লিখিত অভিযোগ দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কিন্তু তার আগেই একধরনের অস্থির পরিস্থিত সৃষ্টি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি
সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে বাধাগ্রস্ত
হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, উন্নয়ন কাজ।’
উপমন্ত্রী বলেন,
‘বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান চর্চার একটি স্থান। এখানে সবারই যৌক্তিক মত
প্রকাশের সুযোগ আছে। যদি কারও অভিযোগ থাকে সেটি তদন্ত সাপেক্ষে আমরা
ব্যবস্থা নেব।’
ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা :
আমাদের
সাভার সংবাদ দাতা মো. শামীম হোসেন জানিয়েছেন, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক
( সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি সম্পর্কিত সকল কার্যক্রম স্থগিত ঘোষনা করা
হয়েছে। তবে অনলাইনে বিষয়ভিত্তিক ফর্ম পূরণ পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী
চলবে। গতকাল কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির সচিব আবুর হাসান সাক্ষরিত এক
বিজ্ঞপ্তিতে একথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষা
বর্ষের স্নাতন সম্মান ভর্তির লক্ষ্যে ০৭-১১-১৯ তারিখের চারুকলা বিভাগের
ব্যবহারিক পরীক্ষাসহ অন্যান্য সবকল ইউনিটের ভর্তি সম্পর্কিত কার্যক্রম
অনিবার্য কারণ বশত স্ঞগিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র অনলাইনে বিষয়ভিত্তিক পছন্দ
ক্রমের ফরম পূরণ আগের নির্দেশনা অনুযায়ী চলবে। এছাড়া ভর্তি সম্পর্কিত
নির্দেশান পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, চলমান
ভিসি বিরোধী আন্দোলনে মঙ্গলবার ছাত্রলীগের হামলাকে কেন্দ্র করে
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।