August 9, 2026, 8:45 am

টেন্ডার ও ক্যাসিনো বাণিজ্য: যুবলীগে ম্লান আ’লীগের ইমেজ

টেন্ডার ও ক্যাসিনো বাণিজ্য: যুবলীগে ম্লান আ’লীগের ইমেজ

ডিএন২৪ ডেস্কঃ আওয়ামী লীগের অন্যতম অঙ্গ সংগঠন আওয়ামী যুবলীগ। ক্ষমতাসীন দলটির ভ্যানগার্ডও বলা হয় যুবলীগকে। এই সংগঠনটি বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রাম মোকাবেলায় রাজপথে সাহসী ভূমিকা রেখে আসছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি বেশ সুনাম কুঁড়িয়েছে।

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুএকটি ব্যাতিক্রম বাদে প্রায় প্রতিটি সম্মেলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব পেয়েছে যুবলীগ। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রাম মোকাবেলায় এবং বিরোধী দলে (আওয়ামী লীগ) থাকলে বিক্ষোভে রাজপথ কাঁপিয়েছে যুবলীগ। দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবলীগ যে সবচেয়ে শক্তিশালী, সেটি রাজনীতি সচেতনরা একবাক্যে মেনে নেবেন। দৃশ্যমান এই সত্যটি যারা মানতে চাইবেন না তারা শুধুমাত্র তর্কের জন্যই এমনটি করবেন। সংগঠন হিসেবে যুবলীগের প্রশংসা যেমন আছে তেমনি বদনামও কম নয়। সেটি নেতৃত্বের কারণেই। চলমান মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যুবলীগের প্রভাবশালী নেতাদের নাম চলে আসছে। অনেকে গ্রেফতারও হয়েছেন। অনেকে গ্রেফতারের অপেক্ষায়। প্রতিষ্ঠার পর এবারের মতো এতোটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি যুবলীগ কখনও পড়েছে কিনা সেটি তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। যুবলীগ নেতাদের টেন্ডারবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে টানা তিন বার ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের অর্জন ম্লান হতে বসেছে।

১৯৭২ সালের ​নভেম্বরে শেখ ফজুলল হক মণির হাত ধরে যুবলীগের পথচলা শুরু। এরপর থেকে যারাই যুবলীগের নেতৃত্বে এসেছেন প্রত্যেকেরই দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সম্পন্ন ছিলেন। তাদের মেধা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল আকাশচুম্বি।

যুবলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন ফজলুল করিম সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজমদের মতো দক্ষ সংগঠক। তাদের কোনো কমিটি নিয়েই এতোটা সমালোচনা হয়নি, যতোটা হচ্ছেন বর্তমান কমিটি নিয়ে। যুবলীগের খোদ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সংগঠনের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর। তাদের কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতির মাধ্যমে কাড়ি কাড়ি টাকা অর্জনের। কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসার।

বৃহস্পতিবার যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করা হয়েছে। আগামী ৩ দিনের মধ্যে তার এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য জানাতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

বিএফআইইউয়ের চিঠিতে ওমর ফারুকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরও (এনআইডি) উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আগে থেকেই মৌখিকভাবে তার ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে তার হিসাব থেকে টাকা তোলা সম্ভব হচ্ছিল না। তার নামে দুটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

সোনালী ব্যাংকে তার দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে সাড়ে ১১ কোটি টাকা ঋণও রয়েছে। ক্যাসিনো ও জুয়াবিরোধী অভিযানে যুবলীগের পদস্থ কয়েকজন নেতাকর্মী আটক হয়েছেন। এর মধ্যে জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াসহ আরও অনেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, অস্ত্র ও মদ আটক করেছে র‌্যাব। আটকরা তাদের কর্মকাণ্ডের অংশীদার, সুবিধাভোগী ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর নাম উল্লেখ করেছেন। এ কারণেই তার ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

যুবলীগের দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানকে খুঁজছে পুলিশ। যুবলীগ অফিসের পিয়ন থেকে দফতর সম্পাদক হওয়া এ নেতা কয়েক বছরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।

তিনি কেন্দ্রীয় যুবলীগের কার্যালয়ে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন ২০০৫ সালে। বেতন ছিল মাসে ৫ হাজার টাকা। সাত বছর পর বনে যান কেন্দ্রীয় যুবলীগের দফতর সম্পাদক। যুবলীগের সবশেষ কমিটিতে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব।

তিনি এখন একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক। সংগঠনের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর আনুকূল্যে রাতারাতি জীবনধারা বদলে গেছে তার। কোটিপতি আনিস এখন ওমর ফারুক ছাড়া কাউকে পরোয়া করেন না।

২০০৫ সালে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যখন আনিসের চাকরি হয়, তখন তিনি নেতাদের হুট ফরমায়েশ শোনার পাশাপাশি কম্পিউটার অপারেটরের কাজও করতেন। এই সুবাদে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি কার্যালয়ে আসা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গেও সখ্য হয় তার। সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তিকে পিছিয়ে থাকা নেতাদের নজরেও চলে আসেন আনিস।

কেন্দ্রীয় যুবলীগ সারা দেশে যেসব কমিটি দিত, সেগুলো কম্পিউটারে টাইপ করে দিতেন আনিস। টাইপ করতে গিয়ে কোন জেলায় কে সভাপতি কে সম্পাদক তা নখদর্পণে চলে আসে আনিসের। মুখস্থ বলে দিতে পারতেন যেকোনো কমিটির নেতার নাম। এসব কারণেই চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হয়ে যান তিনি। আবার জেলাপর্যায়ের নেতারাও কমিটির বিষয়ে কেন্দ্রের তথ্য বা সিদ্ধান্ত জানতে তাকে ফোন করতেন। এভাবে জেলা নেতাদের সঙ্গেও তার সখ্য হয়ে যায়। ২০১২ সালে যুবলীগের কমিটি হলে আনিস পেয়ে যান উপদফতর সম্পাদকের পদ। শীর্ষ নেতার আশীর্বাদ থাকায় ছয় মাস পর খালি থাকা দফতর সম্পাদক পদে পদোন্নতি পেয়ে যান আনিস।

কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনিসকে সবাই ‘ক্যাশিয়ার’ বলেই চেনে। তবে গত এক যুগে তিনি শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। কিছু যুবলীগ নেতার সব ধরনের অপকর্মের সঙ্গী এই আনিস।

ধানমণ্ডি ১৫ নম্বর সড়কে প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে আনিসের। তবে ওই ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন না। বর্তমানে রাজধানীর ধানমণ্ডির ১০/এ সড়কের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে থাকেন কাজী আনিস। ওই ফ্ল্যাটটিও তার নিজের।

শুধু তাই নয়, গোপালগঞ্জে আনিসের রয়েছে বিপুল স্থাবর সম্পত্তি। আগে পাঁচ-ছয় বিঘা জমি ছিল তাদের। গত চার বছরে কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন। বাড়ি করেছেন, পেট্রলপাম্প এবং তার পাশের জমি কিনেছেন। এর মধ্যে পেট্রলপাম্পটি কিনতে কোটি টাকা লেগেছে আনিসের। পাশেই ৫ একর জমি আছে তার কেনা। এ ছাড়া ঢাকায় আনিসের তিনটি বাড়ি আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদাবাজি, দরপত্র থেকে কমিশন ও যুবলীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদবাণিজ্য করেই বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছেন কাজী আনিস। যুবলীগ নেতারা জানান, আনিসের দাপটে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টেকা দায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতারা অভিযোগ করেন, আনিসের বিরুদ্ধে কথা বলে টেকা কঠিন। বিভিন্ন ইউনিটে বছরের পর বছর সম্মেলন না করে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চালানো হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে এসব আহ্বায়ক কমিটি বানানো ও দীর্ঘদিন বহাল থাকার সুযোগ করে দিচ্ছেন আনিস। আনিসের দাপটে পুরনো অনেক নেতা যুবলীগে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন।

নেতাকর্মীরা জানান, জিকে শামীম, খালেদসহ কয়েকজনের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়েন আনিস। তার সিন্ডিকেট চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্লাবে জুয়ার আসর চালানোসহ সব অপকর্মে জড়িত।

এত গেল যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের ফিরিস্তি। সংগঠনটির ঢাকা মহানগরের বহু নেতার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির বড় বড় অভিযোগ। তাদের মধ্যে রয়েছেন-ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট, যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়্যা, যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা জি কে শামীম। তাদের মধ্যে ক্যাসিনো সম্রাট ও সাঈদ ছাড়া সবাই গ্রেফতার। গ্রেফতারের পর খালেদ ও জি কে শামীমের দেয়া তথ্যে যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদের কাছ থেকে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা পূর্বাচল প্রকল্পে প্লটের জন্য ৫ কোটি টাকা নিয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউছার এবং ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটও তার কাছ থেকে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের অর্থ।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রভাবশালী নেতাকেও দুই দফায় মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন তিনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নিতেন। খালেদ তার সাম্রাজ্য ধরে রাখতে গড়ে তুলেছেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী।

এর মধ্যে ১২ অস্ত্রধারী ক্যাডার সার্বক্ষণিকভাবে তার সঙ্গে থাকত। কিন্তু এখন এদের কারও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। খালেদ জানিয়েছেন, অবৈধ আয়ের টাকা নিজের এবং স্ত্রীর নামে ছয়টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তিনি গচ্ছিত রেখেছেন।

সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে তার তিনটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট আছে। দেশি-বিদেশি ব্যাংকের এসব হিসাবে প্রায় ৩১ কোটি টাকা গচ্ছিত রেখেছেন তিনি।

এদিকে যুবলীগের আরেক নেতা টেন্ডার কিং জি কে শামীমও কাজ পেতে সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী নেতাদের বড় অঙ্কের অর্থ দিতেন। তার বিশাল ক্যাডার বাহিনীর বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৮ অস্ত্রধারী ক্যাডারসহ অনেকেই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

দুই যুবলীগ নেতা খালেদ এবং জি কে শামীমকে গ্রেফতারের পর দুই দফা রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে তারা এসব তথ্য দিয়েছেন।

অবৈধ ক্যাসিনো সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে খালেদ ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলেছেন। ক্যাডার বাহিনীতে ঢাকার তিনজন কাউন্সিলরও রয়েছেন। যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যা মামলার তিন আসামিরও ঠাঁই হয়েছে তার বাহিনীতে।

তাদের মাধ্যমে খালেদ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। ঢাকার অপরাধ জগতের ভাড়াটে কিলার, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের সঙ্গেও ছিল তার গভীর সখ্য। এমনকি দুবাই প্রবাসী শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকেও তিনি এক সময় হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাতেন।

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, খালেদ যাদের নাম বলেছেন তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন।

এদের একজন খালেদের কাছ থেকে পূর্বাচল প্লটের জন্য ৫ কোটি টাকা নিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর ইসমাইল হোসেন সম্রাট একাধিক ঠিকানা বদল করে এই প্রভাবশালী নেতার বাসায় আত্মগোপন করেন।

এদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ জানিয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউছার তার কাছ থেকে ২০১৫ সালে ৫০ লাখ থেকে ৬০ লাখ টাকা নিয়েছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট নিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা।

আবদুর রহমান এবং নুরুল হুদা নামে দু’জন নিয়েছেন ২ কোটি টাকা। আনিছুর রহমান নিয়েছেন ৪০ লাখ টাকা। যুবলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা দুই ঈদে তার কাছ থেকে নিয়েছেন ২০ লাখ টাকা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, খালেদ তাদের বলেছেন, ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবের ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি। তবে ঢাকার ক্লাবপাড়াসহ নগরীর ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট।

এছাড়া ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক ছিলেন মোল্লা আবু কাউছার। দিলকুশা, মোহামেডান এবং আরমাবাগ ক্লাবের ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক ছিলেন সিঙ্গাপুরে পলাতক যুবলীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউছার যুগান্তরকে বলেন, খালেদ যদি টাকা দেয়ার দাবি করে থাকে সেটা ঠিক নয়। আর ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সভাপতি আমি। তবে আমি ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত নই।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কীকে হত্যা করে তার প্রতিপক্ষ। একই দিন রাতে মিল্কী হত্যায় সরাসরি জড়িত যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক এসএম জাহিদ সিদ্দিকী ওরফে তারেক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। ওই সময় তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল মতিঝিল, খিলগাঁও, রামপুরা এবং রমনার অপরাধ সাম্রাজ্য।

এ দু’জনের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই উত্থান ঘটে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার। তারপর ধীরে ধীরে তিনি এসব এলাকার অপরাধ জগতে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। টেন্ডার, চাঁদাবাজি এবং দখলবাজি শুরু করেন তিনি। গড়ে তোলেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী।

এই বাহিনীতে মিল্কী হত্যা মামলার তিন আসামিরও ঠাঁই হয়। এই তিনজন হলেন কাইল্লা আমিনুল, অঙ্কুর এবং উজ্জ্বল মোর্শেদ। এমনকি খালেদ বিভিন্ন এলাকায় টর্চার সেলও গড়ে তোলেন।

গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ বলেছেন, অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে তিনি তিনজন কাউন্সিলরকেও দলে নেন। এই তিন কাউন্সিলর হলেন- ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক একেএম মমিনুল হক সাঈদ, আনিসুর রহমান ও রিজভী।

তাদের মধ্যে ক্যাসিনো-কাণ্ডের পর সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান যুবলীগ নেতা সাঈদ। তার ক্যাডার বাহিনীর অন্য সদস্যদের মধ্যে কাউন্সিলর আনিসের সহযোগী পিচ্চি রুবেল, কাউন্সিলর সাঈদের সহযোগী হাসান উদ্দিন, আরামবাগ ক্লাবের প্রহরী জামাল ও সুমন, দক্ষিণ যুবলীগের এনামুল হক আরমান ওরফে ক্যাসিনো আরমান, ক্যাসিনো বকুল, ল্যাংড়া জাকির ও জিসান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, খালেদ বিভিন্ন এলাকার জুয়া, টেন্ডার, মাদক ব্যবসা, পরিবহন চাঁদাবাজি, ভবন দখলসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার কথা কেউ না শুনলে তাকে টর্চার সেলে নির্মম নির্যাতন করা হতো।

এমনকি যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও তার হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ পঙ্গু হয়েছেন। অনেকে আবার দেশ ছেড়েও পালিয়েছেন।

সূত্র জানায়, ক্যাসিনো নামে রাজধানীতে জমজমাট ১২টি ক্লাব। এসব জুয়ার আসর থেকে যুবলীগের নামে দৈনিক ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলা হয়। প্রতিটি ক্লাব থেকে দৈনিক চাঁদা নির্ধারণ করা আছে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দৈনিক চাঁদার পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।

মাসে চাঁদা ওঠে ৩৬ কোটি টাকা। বছরে এই টাকার পরিমাণ ৪৩২ কোটি, যা অবিশ্বাস্য বটে। তবে বিশাল অঙ্কের এই টাকার ভাগ যায় সরকারি দলের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে। প্রতি মাসে চাঁদা হিসেবে আদায় করা এই টাকাকে বলা হয় ‘প্রক্রিয়ার টাকা’।

সূত্র বলছে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ইতিমধ্যে জুয়ার আস্তানাগুলোয় সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকার জুয়াজগতের অঘোষিত সম্রাট হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট পলাতক।

সম্রাটের নেশা ও ‘পেশা’ জুয়া খেলা। তিনি একজন পেশাদার জুয়াড়ি। আলোচিত এই সম্রাট টাকার বস্তা নিয়ে জুয়া খেলতে যান সিঙ্গাপুরে। মাসে অন্তত ১০ দিন তিনি সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলেন। এটি তার নেশা।

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকেও আসেন জুয়াড়িরা। কিন্তু সেখানেও সম্রাট ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। প্রথমসারির জুয়াড়ি হওয়ায় সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার বিশেষ ব্যবস্থাও আছে।

এয়ারপোর্ট থেকে মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনো পর্যন্ত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিলাসবহুল গাড়ি ‘লিমুজিন’যোগে। সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলতে গেলে সম্রাটের নিয়মিত সঙ্গী হন যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমানুল হক আরমান, মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার, সম্রাটের ভাই বাদল ও জুয়াড়ি খোরশেদ আলম।

এদের মধ্যে সাঈদ কমিশনারের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি ১০ বছর আগে ঢাকায় গাড়ির তেল চুরির ব্যবসা করতেন। এখন তিনি এলাকায় যান হেলিকপ্টারে চড়ে। এমপি হতে চান আগামী দিনে। যার তোড়জোড় শুরু হয়েছে এখন থেকে। দোয়া চেয়ে এলাকায় লাগানো হচ্ছে পোস্টার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের অফিস রাজধানীর কাকরাইলে রাজমণি সিনেমা হলের উল্টোপাশে। সেখানেও গভীর রাত পর্যন্ত ভিআইপি জুয়া খেলা চলে। প্রতিদিনই ঢাকার একাধিক বড় জুয়াড়িকে সেখানে জুয়া খেলার আমন্ত্রণ জানানো হয়।

কিন্তু সম্রাটের অফিসে খেলার নিয়ম ভিন্ন। সেখান থেকে জিতে আসা যাবে না। কোনো জুয়াড়ি জিতলেও তার টাকা জোরপূর্বক রেখে দেয়া হয়। নিপীড়নমূলক এই জুয়া খেলার পদ্ধতিকে জুয়াড়িরা বলেন ‘চুঙ্গি ফিট’। অনেকে এটাকে ‘অল ইন’ও বলেন। জুয়াজগতে ‘অল ইন’ শব্দটি খুবই পরিচিত।

অল ইন মানে একেবারেই সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া। সংসারের ঘটিবাটি বিক্রি করে একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মতোই জুয়াড়িদের অল ইন হওয়া।

তাদের মতো আরও অনেক যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। যুবলীগের এসব নেতার কর্মকাণ্ডে যে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলেও ইমেজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে সেটি ফুটে ওঠেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায়ও। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ সেপ্টেম্বর দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি যুবলীগের কয়েকজন নেতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তারা শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুবলীগের ঢাকা মহানগরের একজন নেতা যা ইচ্ছে করে বেড়াচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে।

আরেকজন এখন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। সদলবলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরেন। এসব বন্ধ করতে হবে। যারা অস্ত্রবাজি করেন, যারা ক্যাডার পোষেণ, তারা সাবধান হয়ে যান, এসব বন্ধ করুন। তা না হলে যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরও দমন করা হবে।

এরপরই শুদ্ধি অভিযানে নামে আইনশৃংখলা বাহিনী। গ্রেফতার করা হয় একে একে খালিদ, শামীমসহ যুবলীগ নেতাদের।

নিউজটি শেয়ার করুন

Comments are closed.




© All rights reserved © 2020 districtnews24.Com
Design & Developed BY districtnews24.Com