August 9, 2026, 7:32 am

একটি শিশুর লাশের আর্তনাদ ও কবরস্থানের ইতিহাস

একটি শিশুর লাশের আর্তনাদ ও কবরস্থানের ইতিহাস

তিন দিনের শিশু বাচ্চাকে কবর থেকে তুলে রাস্তায় ফেলে রাখার একটি ভিডিও ইদানিং সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছে। বলা হচ্ছে, বহিরাগত ও স্থানীয় কিছু উগ্র-ধর্মান্ধ মাইকে ঘোষণা দিয়ে আহমদীয়া মুসলিম ফির্কা পরিবারের নিষ্পাপ মৃত শিশুর লাশের অবমাননা করেছে এবং এই ধরনের নেক্কার জনক ঘটনা ঘটিয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়ে উক্ত কবরস্থানের পূর্বাপর ইতিহাস জানার চেষ্টা করে এবং স্থানীয় আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করে।


সুহিলপুর ইউনিয়নের গ্রাম ঘাটুরা। এই ঘাটুরাতে আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত ঘাটুরা মসজিদের দক্ষিণপাশে বা ঘাটুরা গ্রামের সাতবাড়িয়াতে একটি প্রাচীন কবরস্থান রয়েছে। এই গ্রামে এক হিন্দু জমিদার ছিলেন যার নাম ছিল রায় সাহেব। তিনি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তিতাস নদীতে গোসলের উদ্দেশ্যে বা ভ্রমনে গেলে এই পথেই যেতেন। কথিত আছে, পুজা দেয়ার উদ্দেশ্যেও তারা এ পথেই নদীতে যেতেন। এই কারনে নদী পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। এই গ্রামে তখন নির্দিষ্ট কোন কবরস্থান ছিল না। গ্রামে বিভিন্ন জাতি, গোত্রের লোক বসবাস করলেও গুটি কয়েক লোকের কবর এখানে বিদ্যমান ছিল। অতএব খালি জায়গা পেয়ে একে একে বহুলোক এখানে কবর দেয়া শুরু করল। রায় সাহেব বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা এই জায়গা আমার কাছ থেকে কিছু মুল্য দিয়ে লিখে নাও। সেই সময় এদিকে কেউ কর্ণপাত করে নি। অবশেষে রায় সাহেব জায়গাটি পরিত্যাক্ত হিসেবে ঘোষণা দিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রায় সাহেব ও তার পরিবার দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই জমির মালিক খুঁজে না পাওয়ায় এটি খাস হয়ে যায়। ফলে সব ফির্কার মুসলমান নির্দিধায় এই জমিতে মৃতদের দাফন করতে থাকে এবং তাদের মাঝে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বহু সদস্যের কবর বিদ্যমান। জমিটি কিছুটা নিচু ছিল, তাই আহমদীদের উদ্দোগে তাদেরই জমি থেকে মাটি তুলে উক্ত কবরস্থানের নিচু জমি ভরাট করা হয়। এভাবে শত বছর ধরে যে যেভাবে পেরেছে কবর দিয়েছে এবং আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের সদস্যদের কবরের ওপর অন্যান্য মুসলমান মৃতদের কবর হয়েছে আবার অন্যান্য মুসলমানদের কবরের ওপর আহমদী মুসলমানদের কবর হয়েছে। বলা চলে স্বল্প এ জায়গায় হাজার মানুষের কবর একাকার হয়ে গেছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন আহমদী সদস্য বলেন, বর্তমানে এই করবস্থান ডিসি সাহেবের অধিনে আছে। প্রায় শত বছর ধরে আহমদীরা এই জমিতে নিজেদের মৃত ব্যক্তিদের কবর দিয়ে আসছে। ঘাটুরার প্রয়াত সব আহমদী এখানে সমাহিত আছেন। বর্তমানে যে ঘটনা ঘটছে পূর্বে কখনও ঘটে নাই। কেউ কেউ বিরোধিতা করলেও তাদের মধ্যে থেকেই তাদের থামিয়ে দিত। কয়েক বছর আগে চেয়ারম্যান সাহেব বলেন, সবাই দেশের নাগরিক সুতরাং আপনারা জমির পশ্চিম পাশে কবর দিবেন। এরপর থেকে আমরা এই পশ্চিম পাশে কবর দিয়ে আসছি। পশ্চিম পাশে সব আহমদীর কবর। তাছাড়া আহমদী পূর্বপুরুসদের কবর সমস্ত কবর স্থান জুড়েই রয়েছে। উগ্র ধর্মান্ধ কিছু মানুষ মাইকে ঘোষণা করে অল্প কিছু উগ্র ধর্মান্ধ এখানে এসে মৃত দেহটি কবর তেকে তুলে ফেলে আপত্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আহমদী সদস্যরা উপড়ে ফেলা নিষ্পাপ শিশুটির কাছে পৌঁছানের পূর্বেই পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের এক সদস্য বলেন, উগ্র ধর্মান্ধ মোল্লাদের দাবি হল, শিশু সন্তানকে কবর থেকে তুলে ফেলে দিয়ে কবরস্থানকে পবিত্র করা হয়েছে। তাদের এমন বর্বর অনৈসলামিক কথায় আমরা মর্মাহত। তাহলে এখন তাদের উচিত হবে, আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের আরো শত শত মৃত ব্যক্তি এই কবরস্থানে শায়িত আছেন। তাদের কবর চিহ্নিত করে তাদের কঙ্কাল মাটি থেকে তুলে ফেলে দেওয়া। তারা কি এই কাজ করতে পারবে? আহমদী-অআহমদী সকল মৃতদের দেহ শতবছর ধরে মাটি হয়ে একাকার হয়ে গেছে। তাদেরকে কীভাবে পৃথক করবে? তারা কবরস্থান পবিত্র করতে শত বছর ধরে প্রয়াত আহমদী মুসলমানদের সব লাশ তুলে ফেলুক। তা যদি তারা না পারে, আর তা সম্ভবও না। তাহলে এই নিষ্পাপ ৩ দিনের শিশুটিকে কবর থেকে তুলে ফেলে দিয়ে তারা কোন্ ইসলামের কাজটা করল?


ঘাটুরার স্থানীয় আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের আরেক সদস্য বলেন, আমাদের পিতৃপুরুষ এখানে শত শত বছর পূর্ব থেকে বসবার করছি। আমরা বানভাসি মানুষ না যে, উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। আমরা এখানে আদিবাসী এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী পূর্ণ নাগরিক। এ দেশের নাগরিক হিসেবে সরকারী কবরস্থানে অন্যদের যতটুকু অধিকার আছে, আমাদেরও সমঅধিকার রয়েছে। স্থানীয়রা সবাই মিলে মিশে যুগ যুগ ধরে সেই অধিকার ভোগ করে এসেছে। ইদানিং হঠাৎ ঢাকা থেকে অথবা ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর থেকে উগ্র ধর্মান্ধ হুজুররা এসে স্থানীয়দের বিভিন্নভাবে উস্কে দিয়ে তাদের দ্বারা এরূপ অপকর্ম করাচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রশাসন এবং গোয়েন্দা বিভাগ যদি তৎপর থাকে তাহলে ভবিষ্যতে এমন উৎকো উপদ্রোব বন্ধ হতে পারে। এ বিষয়ে আমরা প্রশাসনকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি এবং সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তারা দোষীদের খুঁজে বের করবেন বলে আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Comments are closed.




© All rights reserved © 2020 districtnews24.Com
Design & Developed BY districtnews24.Com