August 9, 2026, 7:45 am
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: দেশের ঐতিহ্যবাহী সর্ব বৃহৎ চিনি শিল্প প্রতিষ্ঠান দর্শনা এ্যান্ড কোম্পানীর চিনিকলে চলতি মাড়াই মওসুমে দেদারছে শিকড় ও পাতাযুক্ত আখ ক্রয় করার ফলে চিনির উৎপাদন যেমন স্মরনকালের তলানীতে ঠেকেছে, তেমনি আধুনিকায়নে কোটি কোটি টাকা খরচ করার পরও মানসন্মত চিনি উৎপাদনের পরিবর্তে তৈরী হচ্ছে দানাবিহীন পাউডার। যা বিগত ৮১ বছরের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে শ্রমিক কর্মচারিরা মনে করছে। কতৃপক্ষ চেষ্টা করেও কোন ভাবেই চিনি আহরণের হার উর্দ্ধমুখি করতে পারছে না, কি কারণে চিনি আহরণের হার নিম্নমুখি হচ্ছে তারও কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। চিনি উৎপাদনে রিকভারীই শুধু কম হচ্ছে না বরং চিকন দানার লালচে চিনি তৈরী হচ্ছে দেখে মনে হচ্ছে প্রায় পাউডার। ফলে চিনির গুণগত মানহীন এই চিনি গুদামজাত করার পর কত দিন অক্ষত থাকবে তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানাগেছে, গত ২৯ নভেম্বর দর্শনা কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক ভাবে ২০১৯-২০ মাড়াই মওসুম শুরু করে। শুরুর আগেই গোডাউনে থাকা চিনি বাজার দর ছাড়া কেজি প্রতি ৩ টাকা কমে বিক্রি করে দেয়। এতে করে প্রায় আড়াই কোটি টাকা উৎপাদিত চিনি থেকে লোকসান গুণতে হয়। বিগত দিনে জোড়াতালি দিয়ে নিম্নমানের চিনি উৎপাদন করায় তা গলে পচে নষ্ট হচ্ছিলো বলে লোকসান কমাতে এই উদ্যোগ নেয়া হয় বলে চিনিকল কর্তৃপক্ষ জানায়। তাই চলতি মওসুমে ভাল মানের চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু চিনিকল চালুর ২৫ কার্য দিবস অতিবাহিত হবার পর দেখা যাচ্ছে চিনি আহরণের হার সর্বকালের নিম্নস্তরে ঠেকেছে। বর্তমানে চিনি আহরণের হার ৫ শতাংশের নিচে। কোন ভাবেই আহরণের হার উর্দ্ধমুখি করতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা। কি কারণে আহরণের হার উর্দ্ধমুখি হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানাগেছে, বর্তমানে চিনিকল কর্তৃপক্ষ যে আখ উৎপাদন করে তাতে রস নেই বললেই চলে। অনেকটা চিকন এবং বাঁশের মত শক্ত আখ মাড়াই করছে। যাতে চিনির পরিমান খুবই কম। মানহীন এ আখ নিজেরা যেমন উৎপাদন করছে তেমনি ওই আখ লাগানোর জন্য চাষিদের মধ্যে বীজ আখ বিক্রি করা হয়েছে। চাষিরা সেই আখ উৎপাদন করে পুনরায় চিনি কলে বিক্রি করছে। এছাড়াও মাটি ও আর্বজনাযুক্ত আখ দেদারছে চিনকিলে কেনা হচ্ছে। আবর্জনাযুক্ত আখ পরিস্কার করে মোটা দানার চিনি উৎপাদন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে চিনির রঙ আগের মত লালচে সেই সাথে দেখতে অনেকটায় পাউডারের মত মনে হচ্ছে। হাতে নিয়ে কিছুক্ষন রাখলেই তা গলে যাচ্ছে। উৎপাদিত চিনি গোডাউনে রাখা হলে তা কত দিন টেকসই হবে তা নিয়ে অভিজ্ঞ মহলে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। অপর দিকে প্রতি ১শ কেজি আখে চিনি উৎপাদন হচ্ছে ৫ কেজিরও কম। ১শ কেজি আখের দাম ৩শ টাকা। ৫ কেজি চিনির দাম ২৫০ টাকা। জমি পরিপাটি এবং আখ লাগিয়ে চিনি উৎপাদন পর্যন্ত সকল খরচ হিসাব করলে এ বছর প্রতি কেজির চিনির উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ৩শ টাকা। ৫০ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি হলে কেজি প্রতি লোকসান হবে প্রায় ২৫০ টাকা। গত মওসুমে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ পড়ে ছিল ২৩২ টাকা। চিনি উৎপাদনের খরচের মধ্যে আছে আখের মূল্য, পরিবহণ খরচ, শ্রমিক মুজরি, অন্যান্য উৎপাদান খরচ। ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ কার্যদিবসে চিনিকল কর্তৃপক্ষ আখ মাড়াই করেছে ২৭ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন, তা থেকে চিনি উৎপাদন হয়েছে ঐদিন পর্যন্ত ২২ হাজার ১৭০ বস্তা (৫০ কেজি)। সরবরাহকৃত আখের চাইতে চিনি উৎপাদন কম হয়েছে ২৭২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন অর্থাৎ ৫ হাজার ৪৫০ বস্তা। শুরু থেকেই চিনি আহরণের হার রয়েছে ৫ শতাংশেরও নিচে। যে কারণে কোন হিসাবই মিলাতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
সাধারনতঃ মওসুমের শুরুতেই চিনি আহরণের হার বেশি থাকে এবং শেষের দিকে এসে কমে যায়। চলতি মাড়াই মওসুমের শুরুতেই যদি এ অবস্থা দাড়ায় তাহলে শেষের দিকে কি হবে তা সহজেই অনুমেয়। সুত্র জানিয়েছে- চিনি উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পিছনে রয়েছে মানসন্মত আখের অভাব, মাটি ও আবর্জনা যুক্ত আখ মিলে সরবরাহ, ধারণ ক্ষমতার চাইতে বেশি আখ মাড়াই করে রস ড্রেনে ফেলা, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্লাট ফর্মে ও মাঠে আখ শুকানো, আখ থেকে রস ঠিকমত বের না করা, সর্বপরি দক্ষ জনবলের অভাবে চিনি আহরণ হার কমে হচ্ছে। শুধু চিনি উৎপাদনেই লোকসান হচ্ছে না, অদক্ষ জনবল, পরিকল্পনার অভাব, নি¤œমানের আখ চাষ, ক্রয় বিক্রয়ে দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয় খরচ, টে-ারে দুর্নীতি, ব্যায়ের খাত বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন অনিয়ম যেন বাসা বেঁধে বসেছে কেরু কোম্পানীতে। ফলে কর্মকর্তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটলেও চিনিকলটির ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। প্রতিবছর চিনি উৎপাদন বিভাগের লোকশান যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। অথচ একই সময়ে জিলবাংলা চিনিকলে চিনি আহরণের হার ৬.৫৯ শতাংশ, নর্থব্যাঙ্গল চিনিকলে ৬.৪৫ শতাংশ, ফরিদপুর চিনিকলে ৫.৫০ শতাংশ। গত বছরে চিনি উৎপাদনে চিনিকলের লোকসান হয়ে ছিলো প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। চলতি মওসুমে এ লোকসান ১শ কোটি ছাড়াবে বলে অভিজ্ঞ মহল আশঙ্কা করছে।
অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন শ্রমিক কর্মচারী জানালেন, এ চিনিকলে লোকসানের কারণ শুধু রিকভারী নয় বরং ক্রয়-বিক্রয়ে দূর্নীতি, প্রকল্পের কাজে দূর্নীতি, সমন্বয়হীনতার অভাব, অদক্ষ ব্যবস্থাপনাও দায়ী। নীতি নির্ধারকরা আসেন আর বুলি আওড়ান, গ্রহণ করেন পরিকল্পনা। আর নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে খরচের মাত্রা বাড়িয়ে ফেলেন কয়েক গুণ। চিনিশিল্পকে বাঁচাতে সাশ্রয় নীতির কথা বলা হলেও কোন পরিকল্পনাই কাজে লাগছে না। ফলে প্রতিবছর সরকারি এ চিনিকলের লোকসান ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।
দর্শনা আখিচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল হান্নান জানান, মওসুম শুরু হবার ২ দিন আগে চিনিকল প্রশাসন, সিবিএ নেতারা, আখচাষি এবং আখচাষি কল্যান সমিতির নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়েছিল। সেখানে অলিখিত সিদ্ধান্ত হয় চলতি মওসুমে কোন ভাবেই মাটি এবং আবর্জনা যুক্ত আখ সরবরাহ করা যাবে না। বিনিময়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষ কোন প্রকার ঢলতা কর্তন করবে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে চিনিকল কর্তৃপক্ষ অলিখিত ভাবে ঢলতা কাটার কারণে চিনিকলে মাটি ও আবর্জনাযুক্ত আখ সরবরাহ হচ্ছে। চাষিদের আখ অনেকটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আসলেও চিনিকলের নিজস্ব আখ মাটি ও আবর্জনা যুক্ত আসছে। শুধু তাই নয় কর্মকর্তারাও আর্বজনাযুক্ত আখ মিলে সরবরাহ করছে। যেমন সম্প্রতি চিনিকলের সহকারী ব্যবস্থাপক শেখ শাহাবুদ্দিন এর নিজস্ব আখের ঢলতা কাটার কারনে তুলকালামকান্ড ঘটনোয় নজীরবিহীনভাবে ওজন বন্ধ রেখে কর্মচারীরা তার প্রতিবাদ করে। রিকভারী কম হবার পিছনে এটা একটা বড় কারন হলেও এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছেনা। আর চিনি ভালো করা জন্য চুক্তিভিত্তিক প্যানম্যান দক্ষ লোক নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ কিন্তু ফলাফল শূন্য। এছাড়াও আখ মাড়াই হচ্ছে প্রতিদিন ১২শ থেকে ১৪শ মেট্রিক টন অথচ মাড়াইকৃত আখের রস রাখার ক্যাপাসিটি ১ হাজার মেট্রিক টনের মত। তাহলে বাকি রস কোথায় রাখা হয়? এর সাথে চিনি উৎপাদনে হিসাবের কোন বাত্যয় ঘটছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারি বিশ^াস বলেন, চিনিকলের নিজেস্ব আখ যে ভাবে আবর্জনা যুক্ত হয়ে আসছে তাতে রিকভারী বেশি হবার কোন কারণ নেই। অপরিষ্কার আখ পরিষ্কার করে চিনি তৈরী করতে গেলে হিসাব মিলবে কি করে। শুধু তাই না মিলটি চালু রাখতে ঠিকমত আখ থেকে রস বের করা হচ্ছে না, ফলে রিকভারীতে হিসাব মিলছে না।
সহসভাপতি ওমর আলী বলেন, চাষিরা পরিষ্কার আখ নিয়ে আসলেও চিনিকলের নিজেস্ব আখ আসছে আ-ঝোড়া। ঢলতা কাটার কারণে এমনটি হচ্ছে। আখ পরিষ্কার থাকলেও ঢলতা কাটা পড়ছে। আবার অরিষ্কার থাকলেও ঢলতা কাটা পড়ছে। যেকারনে লেবার খরচ করে চাষিরা পরিষ্কার করার প্রয়োজন মনে করছে না। ময়লা আবর্জনা যুক্ত আখ পরিষ্কার করে সাধা ও মোটা দানার ঝর ঝরে চিনি উৎপাদন সম্ভব না। এ বিষয়ে চিনি উৎপাদন বিভাগের উৎপাদন ম্যানেজার জিল্লুর রহমানের সাথে একাধিক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কেরুজ চিনিকলের এ সমস্ত সমস্যা বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আলী আনছারী দৈনিক সংগ্রামকে জানান- চিনি আহরণের হার বৃদ্ধির জন্য সব রকম চেষ্টায় করা হচ্ছে এবং বর্তমানে বেড়েছে, চিনির মান আগের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক ঝরঝরা। বর্তমানে যে আখ চিনিকলে আসছে তাতে চিনির পরিমান কম, তাই আখ এবং চিনির হিসাব মিলছে না। আবর্জনা মুক্ত আখ সরবরাহ করতে চাষীদের উৎসাহিত করছি, সেক্ষেত্রে ঢলতা কাটা হচ্ছেনা। আগামীতে আশা করছি চিনি আহরণের হার এবং মান দুটিই বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে চিনিকলটিতে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা ওয়ার্কিং সেটাপের অনুকুলে ৬২ জনের জায়গায় আছে মাত্র ৩৯ জন। দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা আছে ১৫ জন। যারা মওসুম শুরু হলে চিনি উৎপাদনের বিভাগটির বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করে থাকেন। দর্শনা এ্যান্ড কোম্পানীর চিনিকলের উপর অত্র অঞ্চালের চাষি, শ্রমিক-কর্মচারীসহ প্রায় ১০ হাজার পবিবারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রুটি রুজি জড়িত। তাই বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করে আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করলে কিছুটা হলেও লোকসান কম হবে বলে সচেতন মহল মনে করছে।