August 9, 2026, 12:51 pm

পেকুয়াকে যিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সন্নিবেশন করেছেন – সেই নক্ষত্রের নীরব পতন

পেকুয়াকে যিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সন্নিবেশন করেছেন – সেই নক্ষত্রের নীরব পতন

সাইফুল ইসলাম বাবুল
১৯৪২ সালের ১৫ এপ্রিল জন্ম নিয়েছিলেন এক শিশুর। প্রত্যন্ত গ্রাম জনপদ পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া গ্রামের জমিদার পরিবারে মরহুম ইসমাঈল  চৌধুরীর তৃতীয় সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল ডাঃ মোক্তার কামাল চৌধুরী। সে অজ পাড়া গাঁ থেকে উঠে আসা শিশুটি তৎকালীন দক্ষিণ মগনামা (অধুনালুপ্ত) জুনিয়ার হাই স্কুলে পড়ালেখা শেষ করে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি হন। মেট্রিকুলেশান পাস করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএসসি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৮ তে সেনাবাহিনীর কমিশন অফিসার হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শুরুর ঠিক এক মাস পূর্বে তাকে যশোরে বদলী করা হয়।

একদিন এক সন্ধ্যায় সে বুঝতে  পারলেন বাঙালি সৈনিক ও অফিসারদের হত্যা এবং বন্ধী করা হবে। তখন যে কজন বাঙালি  ছিলো তাদের নিয়ে বিদ্রোহ করে সেনানিবাস ত্যাগ করলেন। সীমান্ত দিয়ে  ভারত চলে গেলেন। কিন্তু চিন্তা ছিল পরিবারতো ঢাকা সেনানিবাসে। তিনি মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডোদের সাথে যোগাযোগ করে পরিবারকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলেন। তারপর দেশে প্রবেশ করে তিন নম্বর সেক্টরে নিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। নিয়োগ পেলেন তিন নম্বর সেক্টরের মেডিকেল অফিসার হিসেবে। শুরু করলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা। একদল সেনা সদস্য নিয়ে দিনরাত সেবা দিয়ে চল্লেন। ইতিহাসের অন্তরালে অনেক কিছু ঢাকা পড়ে যায়। তার সহযোগী ছিলেন পেকুয়ার আরেক কৃতি সন্তান বাইম্মাখালী গ্রামের ডাক্তার হাকিম আলী। তারা কোনদিন বড় কিছু পাওয়ার আশায় নিজেদের জাহির করেন নাই। 

অফিসার হিসাবে শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মোক্তার কামাল চৌধুরীর নামটি  লিপিবদ্ধ আছে,(তথ্যসূত্র এ টেইল অব মিলিয়ন)। তখন তার পদবি ছিলো ক্যাপ্টেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাত্তোর যে কয়জন সেনা চিকিৎসককে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য বিদেশে পাঠিয়ে ছিলেন তার মধ্যে কর্নেল মোক্তার কামাল চৌধুরী অন্যতম। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অার্থোপেডিক সার্জারি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে পুনরায় সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরে যোগদান করেন। কর্তব্য,  নিষ্টা, দেশপ্রেম নিয়ে তিনি কর্তব্যকাজে রত ছিলেন। কখনো রাজনীতি উচ্চাশা তাকে বশ করতে পারেনাই। 

১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তৎকালীন সেনা শাসকদের পক্ষ থেকে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব এসেছিলো । তিনি বার বার প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরিণতিতে তাকে দুইবার ডিমোশন দেওয়া হয়।

পরিবার সুত্রে জানা যায় তার সাথে অনেক নামিদামি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো। সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল নাছিম, মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ, মেজর জেনারেল এম এ মতিন আরো অনেক। তারা অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তাদের অনুরোধে চলতি বছরে তিনি কক্সবাজার জেলার স্থায়ী ঠিকানায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটের অন্তর্ভুক্ত হন। 

তিনি চলিত ৬ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন) বনানীর সেনা গোরস্থানে রাষ্টীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়। তিনি তিন পুত্র ও আত্মীয় স্বজন  রেখে গেছেন।

জনশ্রুতি আছে তিনি এলাকার কোনো রোগী  পেলে তাকে সেবা দান করে খুবই খুশি হতেন। এবং তাদের প্রচুর সময় দিতেন। গ্রামে এলে তার অনেক শুভাকাঙ্খীআরা রাজনীতির লবিং করার জন্য বলতেন। নীতি নৈতিকতার অবক্ষয়ের যুগে রাজনীতি করার মনমানসিকতা তার নাই বলতেন । তিনিই পেকুয়ার নামটা মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসে সন্নিবেশন করেছেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক। আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করি।

নিউজটি শেয়ার করুন

Comments are closed.




© All rights reserved © 2020 districtnews24.Com
Design & Developed BY districtnews24.Com