August 9, 2026, 11:43 am

অবৈধ গ্যাসের নেতৃত্বে গাজীপুর সিটির কাউন্সিলর মোশারফ

অবৈধ গ্যাসের নেতৃত্বে গাজীপুর সিটির কাউন্সিলর মোশারফ

তিতাসকে ম্যানেজ করেই অবৈধ গ্যাস নিয়ন্ত্রণ অপ্রতিরোধ্য করেছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোশারফ হোসেন। এ খাতে দুর্নীতি অব্যাহত রেখে রাতারাতি কোটিপতি বনে গিয়েছেন তিনি। তুলসীভিটা গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দিয়ে ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নতুন অবৈধ গ্যাস লাইন স্থাপন, নিয়ন্ত্রণ ও বিতরণ সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অসাধু কর্মকর্তারা গোপনে লাইন স্থাপনের অনুমতি দিয়ে মোশারফ হোসেন কাউন্সিলরের সাথে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার বিভিন্ন সময় চাপে পড়লে লাইন বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখিয়ে পূনরায় ভুক্তভোগীদের থেকে বাড়িপ্রতি নিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। ২০০টি বাড়িতে চুলা রয়েছে কমপক্ষে এক হাজার।

ওই এলাকার অবৈধ গ্যাস গ্রাহকরা জানিয়েছেন, নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় প্রতিটি বাড়ি থেকে গড়ে ৮০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন এই কাউন্সিলর। অথচ এই কাজ করতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। ফলে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার জন্য গ্যাস চুরি একটি সহজলভ্য মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়েছে। এই কারণে গ্যাস চুরির ক্ষেত্রে চোরের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। প্রতি মাসেও গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে চুলাপ্রতি ৫০০ টাকা।

প্রাণনাশের ঝুঁকি ও অপচয় : ওই গ্রামের অবৈধ গ্যাস লাইন পরিদর্শন করে দেখা যায়, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি গ্যাস লাইন থেকে যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ‘নিম্নমানের পাইপ দিয়ে সরবরাহ করা এসব অবৈধ লাইনে আগুন ধরে গেলে যেকোনও সময় দুর্ঘটনা ট্র্যাজেটিতে রূপ নিতে পারে’।

তারা আরও জানিয়েছেন, ‘এভাবে গ্যাস চুরি হওয়ায় গ্রাহকরা গ্যাসের প্রচুর পরিমাণে অপচয় করছেন’।

তুলসীভিটায় চুরির উৎসব : গাজীপুরের অন্য অঞ্চলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্ন করা হলেও এ পর্যন্ত তুলসীভিটা গ্রামে লাইন বিচ্ছিন্ন করার কোনও নজির নেই। তিতাসকে ম্যানেজ করেই এই গ্রামে চলছে গ্যাস চুরির মহোউৎসব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর জেলার সদর, কোনাবাড়ি, কাশিমপুর ও শ্রীপুরসহ প্রায় সকল এলাকায় চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের কাজ। গ্যাস অফিসের এক শে্িরণর অসাধু ঠিকাদার স্থানীয় দালালদের সঙ্গে মিশে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিচ্ছেন বাড়ি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।

নাম গোপন করার শর্তে তুলসীভিটা গ্রামের কয়েকজন যোগফলকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যবসা করে অনেক ঠিকাদার ও এজেন্ট কোটিপতি হয়েছেন রাতারাতি। এদের সঙ্গে তিতাস গ্যাস অফিসের কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত এবং ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোশারফ প্রকাশ্যে জড়িত।

তুলসীভিটা গ্রামের গ্রামের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আফসার মাস্টার (৫২), জেলহক (৫৫), মোহাব্বত (৫০), আহম্মদ (৪০), সাহাবুদ্দিন (৪২), আজহার (৩২), রাসেল (৩৫), অলিউল্লাহ (৪৫), জালালউদ্দিন (৪৮), আলালউদ্দিন (৫০), শহীদ (৩৫), মোকছেদ (৩০) ও মৃত মুহাব্বত আলীর বাড়িসহ বর্তমানে প্রায় ২০০ বাড়িতে গ্যাস ব্যবহার করে যাচ্ছেন প্রায় পাঁচ যাবৎ।

ওই গ্রামের ব্যবহারকারী আফসার মাস্টার যোগফলকে জানিয়েছেন, এই এলাকায় দুই তিন মাস যাবৎ অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। আমার বাড়িতেও গ্যাস ব্যবহার করছি। বিলের ব্যাপারে অথবা কাউকে টাকা দিয়ে গ্যাস সংযো স্থাপনের ব্যাপারে তিনি কিছু জানাননি। তিনি আরও বলেছেন, এ ব্যাপারে মোশারফ কাউন্সিলরের সাথে কথা বললে জানতে পারবেন।

অনুসন্ধানের সময় ওই গ্রামের হাজী সেলিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দেখা যায় তাদের ১০টি রুমে ১০টি চুলা রয়েছে। অবৈধ গ্যাস প্রসঙ্গে হাজী সেলিমের স্ত্রী যোগফলকে জানিয়েছেন, ‘আমরা অবৈধভাবে চালাচ্ছি না। ৮০ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস আনছি। প্রতি মাসে ১০টি চুলার জন্য কোনো মাসে ৪ হাজার কোনও মাসে ৫ হাজার পর্যন্ত বিল দিচ্ছি মোশারফ কাউন্সিলরকে। গ্যাসের লোকজনকে ম্যানেজ করেই এই পুরো এলাকায় গ্যাস লাইন দেওয়া হয়েছে। গ্যাসের লোকজন আসলে তিনিই ম্যানেজ করে ওদেরকে’।

অবৈধ গ্যাস লাইন স্থাপন, নেতৃত্ব এবং প্রতি মাসে টাকা নেওয়ার প্রশ্নে মোশারফ কাউন্সিলর যোগফলকে জানিয়েছেন, ‘না তো এইরকম তো না। তুলসীভিটা গ্রামে অবৈধ গ্যাস আছে বইলা তো আমার হয় না’। এটা বলে তিনি কল কেটে দেন এবং তিন মিনিটের মধ্যে কল করে প্রতিবেদকে বলেন, ‘ভাই আমার অফিসে একদিন আসেন আপনি’। কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চা খাওয়ার দাওয়াত রইলো আপনি আসেন একদিন’।

দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর জেলায় বর্তমানে গ্যাসের ৩৪ হাজার বৈধ গ্রাহক রয়েছেন। অবৈধ গ্রাহকের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলে ঠিকাদারদের মতে সংখ্যাটি ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২০ জুন আবেদন করা গ্রাহকদের বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ থাকলে তা বৈধ করার কথা রয়েছে। কিন্তু যে সকল গ্রাহক আবদেন করেননি, তাদের বাসায় রাতারাতি গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে অবৈধভাবে। আবার দীর্ঘ দিন যাবৎ আবেদন করেও গ্যাস পাচ্ছেন না এমন গ্রাহকের সংখ্যাও অনেক।

তিতাসের ম্যানেজার ওয়াজিদ চন্দ্র দেব যোগফলকে জানিয়েছেন, ‘আপনি প্রমাণ দিন আমি ওই কাউন্সিলরের নামে মামলা করে দেবো। ওই এলাকার গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে আমি অবগত নই’

নিউজটি শেয়ার করুন

Comments are closed.




© All rights reserved © 2020 districtnews24.Com
Design & Developed BY districtnews24.Com