August 9, 2026, 12:33 pm
এম, রিদুয়ানুল হক, কক্সবাজারঃ মিজানুর রহমান মানিক। মা বাবার প্রথম সন্তান। তাই সাধ করে নাম রেখেছেন মানিক। বয়স ৩২ বছর চলছে। জন্মের পর যে মানিক পুরো পরিবারে আলো ছড়িয়েছিল, যাকে নিয়ে মা বাবা’র স্বপ্ন ছিল অনেক। মাত্র ৩ বছর মাথায় সেই মানিককের আলো নিভিয়ে দিতে শুরু করে পোলিও নামক রোগ। কৃষক বাবা’র চেষ্টার কমতি ছিল না। কিন্তু না। কোন চিকিৎসা তাকে আরোগ্য করে তুলতে পারেনি। একটি পা ও শরীরের স্পাইনেল পোলিও আক্রান্ত হয়ে বিকলাংঙ্গ হয়ে যায়। সেই থেকে মানিক আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারেননি। বিকলাংঙ্গ শরীরে তার বেড়ে উঠা।
মানিক ২৯ বছর কুঁজো হয়ে হেঁটে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেছেন। জীবন সংগ্রামের সেই লড়াকু মানিক এখন সোজা হয়ে হাটছেন। চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হাবিবুর রহমানের দেয়া একটি প্রতিবন্ধী সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে তার শরীর এখন সোজা হয়ে গেছে। এখন থেকে মানিক সেই সহায়ক উপকরণটি শরীরে লাগিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে হাঁটবেন। মানিক এখন সমাজের অন্যান্য মানুষের মতো পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য নানা স্বপ্নের জাল বুনছেন।
মিজানুর রহমান মানিক স্থায়ীভাবে বাস করেন চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের এসএমচর গ্রামের স্কুল পাহাড় পাড়ায়। যেখানে সবুজে ঘেরা পাহাড়ের ওপাড়ে আকাশ যেন প্রান্ত ছুঁয়ে নেমে পড়েছে। এখানেই হাজারো সুখী মানুষের ভীড়ে এক বুক দুঃখ নিয়ে ৩২টি বছর ধরে বসবাস করে আসছেন মানিক। তিনি ওই এলাকার গরীব কৃষক মনছুর আলমের ছেলে। মানিক জানান; জন্মের ৩ বছরের মাথায় তিনি পলিও আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধীতার শিকার হন। একটি পা খুবই চিকন। শরীরের স্পাইনেল বক্র। এতে তাকে সেই থেকে ২৯ বছর কুঁজো হয়েই চলাফেরা করতে হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে তিনি বিয়েও করেছেন। এখন তার এক ছেলে এক মেয়ে রয়েছে। প্রথম দিকে তার কোন কাজ ছিল না। অনেকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখতেন। পরে তিনি বেসরকারী সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেলাই কাজ কাজ শুরু করেন। সেলাই কাজ করে এখন তার সংসার চলে। অনেকটা স্বাবলম্বীও বলা চলে। প্রতিদিন ৪/৫শত টাকা আয় করেন। স্পাইনাল বাঁকা হওয়ার কারণে সেলাই কাজেও নানা সমস্যা হয়। কুঁজো হয়ে হাঁটতে হয় বলে চলাফেরা করতেও সমস্যা হয়। চকরিয়ার বেসরকারী সংস্থা এসএআরপিভি (সোসাল এ্যাসিস্ট্যান্স এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফর দি ফিজিক্যালি ভালনারেবল)’র পিএইচআরপিবিডি প্রকল্পের রিসোর্চ পার্সন ইয়াছমিন সুলতানা জানান; মানিক এ প্রকল্পের অধীনে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে গঠিত ‘প্রতীক’ দলের সদস্য।
মানিক এ প্রকল্পের অধীনে বহু উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণেও অংশ নেন। এতে তিনি নিজের অধিকার আদায়ে সচেতন হন। ইয়াছমিন সুলতানা আরও জানান; গত ৯ নভেম্বর এসএআরপিভি’র পিএইচআরপিবিডি’র আয়োজনে চকরিয়া থানার হল রুমে শিশু সুরক্ষা, নারী নির্যাতন ও ন্যায় বিচার প্রাপ্তির জন্য আইন সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে এক ওরিয়েন্টেশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মিজানুর রহমান মানিক তার বক্তব্যে কাজ কর্ম ও চলাফেরার ক্ষেত্রে তার শারীরিক অসুবিধার কথা তুলে ধরেন। ইয়াছমিন সুলতানার উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত ওই সভায় চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হাবিবুর রহমান প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মানিককে তার অর্থায়নে সহায়ক উপকরণটি প্রদানের প্রতিশ্রæতি দেন। সহায়ক উপকরণটি তৈরী করেন এসএআরপিভি’র অর্থো প্রসথেসিষ্ট এর ইনচার্জ দেবাশীষ দাশ।
চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হাবিবুর রহমান তার প্রতিশ্রæতি রেখেছেন। রবিবার দুপুর ১২টায় চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হাবিবুর রহমানের রুমে মিজানুর রহমান মানিককে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবন্ধী সহায়ক উপকরণটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন এএসপি শামসুল আরেফিন, এসএআরপিভি’র আঞ্চলিক পরিচালক কাজী মাকসুদুল আলম মুহিত, পিএইচআরপিবিডি’র ইয়াছমিন সুলতানা, আইডিয়া প্রকল্পের আক্তার কামাল মিরাজ প্রমুখ।
মিজানুর রহমান মানিক তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ২৯ বছর পর আমিও মানুষের মতো করে হাঁটবো। এ কথা বলেই মুখে একটু হাঁসি, পরে আবার কেঁদেছেন। তার এ কান্না অনেক সুখের, আনন্দের। তিনি এবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। এটি যেন তার কাছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার চেয়েও অনেক বড় পাওয়া। #